Menu

রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে জাতিসংঘে ৪ দফা প্রস্তাব দেবেন প্রধানমন্ত্রী

কাজিরবাজার ডেস্ক :
রোহিঙ্গা সঙ্কটের স্থায়ী সমাধানে জাতিসংঘে সুনির্দিষ্ট ৪ প্রস্তাব দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের অবশ্যই তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফিরে যেতে হবে। সুনির্দিষ্ট চার প্রস্তাব তিনি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর শুক্রবার উপস্থাপন করবেন বলে জানিয়েছেন। এগুলো হচ্ছে- রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসন এবং আত্তীকরণে মিয়ানমারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পূর্ণ প্রতিফলন। বৈষম্যমূলক আইন ও রীতি বিলোপ করে মিয়ানমারের প্রতি রোহিঙ্গাদের আস্থা তৈরি করা এবং রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের উত্তর রাখাইন সফরের ব্যবস্থা করতে হবে। রাখাইনে আন্তর্জাতিক বেসামরিক পর্যবেক্ষক রেখে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবশ্যই রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণগুলো বিবেচনায় নিতে হবে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অন্যান্য নৃশংসতার ঘটনার বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
মঙ্গলবার জাতিসংঘ সদর দফতরে ইসলামী দেশগুলোর সংগঠন ওআইসি এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা ক্রাইসিস ঃ এ ওয়ে ফরোয়ার্ড’ শীর্ষক এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে এই চার প্রস্তাবের কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উচ্চ পর্যায়ের এ বৈঠকে ওআইসির মহাসচিবসহ ইসলামী বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী ও প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি, বেলজিয়াম, সুইডেন, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী ও প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ এবং ওআইসির মহাসচিব ইউসেফ আহমেদ আল-ওথাইমিন প্রমুখ।
প্রসঙ্গত, আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি এই চার প্রস্তাব তুলে ধরবেন বিশ্বনেতাদের সামনে। এছাড়া রোহিঙ্গা সঙ্কট বড় আকার ধারণ করার পর ২০১৭ সালে জাতিসংঘের ৭২তম সাধারণ অধিবেশনে এ সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরেছিলেন। সেসব প্রস্তাবে কফি আনান কমিশনের সুপারিশগুলোর সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন, রাখাইন রাজ্যে আলাদা বেসামরিক পর্যবেক্ষক সেইফ জোন প্রতিষ্ঠার কথা ছিল। কিন্তু তার একটিও বাস্তবায়ন হয়নি। বরং রোহিঙ্গা সঙ্কট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করেছে।
এদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সৌদি আরব আয়োজিত একটি অধিবেশনে ওআইসির সদস্যভুক্ত বিভিন্ন দেশ জাতিসংঘের ত্রাণ ও পুনর্বাসন সংস্থা ইউএনএইচসিআরকে ২৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে জানা যায়। রোহিঙ্গাদের সহায়তার বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এ ব্যাপারে মুসলিম বিশ্বসহ পুরো পৃথিবী বাংলাদেশের সঙ্গে আছে। সহায়তার ব্যাপারে সবদেশ ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। রোহিঙ্গাদের খাদ্য নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য চাহিদা মেটাতে ২৭০ মিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সৌদি আবর। এছাড়া অন্যান্য দেশ থেকেও আর ৯৬০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা পাওয়া যাবে। এ ব্যাপারে অন্য দেশগুলো সব সময় তাদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। বলা যায়, দাতাদেশগুলো মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। তবে যত দ্রুত এ রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যাবে সেটাই ভাল হবে। এ ব্যাপারে চীনও আর দেরি না করার পক্ষে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীন সহযোগিতা করার ঘোষণা দিয়েছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অধিবেশনের দ্বিতীয় দিন নেদারল্যান্ডসের রানী ম্যাক্সিমার সঙ্গে বৈঠক করেন এবং গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। দুপুরে জাতিসংঘ সদর দফতরে জাতিসংঘ মহাসচিবের দেয়া মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন। এছাড়া বিকেলে জাতিসংঘ সদর দফতরে ‘লিডারশিপ ম্যাটারস-রিলেভেন্স ও অব মহাত্মা গান্ধী ইন দ্য কনটেমপোরারি ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। রাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেয়া নৈশভোজে অংশগ্রহণ করেন। ব্যস্ততম দিন কাটান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তবে উচ্চ পর্যায়ের ওই অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ রোহিঙ্গা নিধনের বর্ণনা দিতে গিয়ে জাতিসংঘের ওই অনুষ্ঠানে এ ঘটনাকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কুখ্যাত কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে হত্যা এবং পরে কম্বোডিয়ায় গণহত্যার সঙ্গে এর তুলনা করেন। রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে মিয়ানমারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। তিনি বলেন, তারা যে অপরাধ করেছে তা কোনভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তারা বার বার ওয়াদার বরখেলাপ করেছে। তাই তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তাদের বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে।
তিনি বলেন, মিয়ানমার যখন এ সমস্যার সমাধানে আগ্রহ দেখাচ্ছে না, তখন সমাধানের দায়িত্ব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপরই বর্তাচ্ছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বক্তব্যের শুরুতেই বলেন, আরও একটি বছর পেরিয়ে গেল, অথচ রোহিঙ্গ সঙ্কটের কোন সমাধান পাওয়া গেল না, এটা হতাশাজনক। বর্তমানে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছেন, যাদের মধ্যে সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা এসেছেন ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে নতুন করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন শুরু হওয়ার পর। জাতিসংঘ ওই অভিযানকে ‘জাতিগত নির্মূল’ অভিযান হিসেবে বর্ণনা করে আসছে। মিয়ানমার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়ায় দুই দফা চেষ্টার পরও রোহিঙ্গাদের কাউকে তাদের ভিটেমাটিতে ফেরত পাঠানো যায়নি।
শেখ হাসিনা বলেন, মানবিক কারণে এই রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দিয়েছিল বাংলাদেশ। তাদের জন্য খাবার, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা, সুপেয় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা বাংলাদেশ করে যাচ্ছে। নিজেদের দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা এই মানুষগুলোর মৌলিক চাহিদা পূরণে যা যা দরকার তা পূরণের চেষ্টা বাংলাদেশ অব্যাহত রাখবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেখানে খুঁজে বের করতে হবে। মানবিক সহায়তা ও অন্যান্য সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের তাৎক্ষণিক প্রয়োজনগুলো মেটানো গেলেও সঙ্কটের অবসানে মিয়ানমারে এর একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ। শত শত বছর ধরে এই রোহিঙ্গারা যেখানে বসবাস করে আসছে, তাদের অবশ্যই সেখানে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। রোহিঙ্গা সঙ্কটকে একটি রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে বর্ণনা করে শেখ হাসিনা বলেন, এ সমস্যার মূল মিয়ানমারে গভীরে প্রেথিত। সুতরাং এ সঙ্কটের সমাধান মিয়ানমারের ভেতরেই পাওয়া যাবে। এদিকে রোহিঙ্গাদের টেকসই, নিরাপদ ও স্বেচ্ছা প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে রাখাইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের চলমান কার্যক্রম অনুসরণ করছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ওআইসি অ্যাড-হক মন্ত্রিপরিষদ গ্রুপের মাধ্যমে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে কক্সবাজারের পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর যে প্রভাব পড়েছে, সে কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গারা ৮০০ একরের বেশি বনভূমিতে আশ্রয় নিয়েছে যাতে বাস্তুসংস্থান ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মানবিক সেবা ও সুরক্ষার সব ব্যবস্থা রেখে রোহিঙ্গাদের জন্য ভাষানচরে আলাদা আবাসনের ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথাও তিনি বলেন।
এদিকে ওই অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ আরও বলেন, রাখাইনে বহু রোহিঙ্গা অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। বিশ্ব যখন এটাকে অতীতের সেই কুখ্যাত কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের সঙ্গে তুলনা করে, তখন মিয়ানমার তা অস্বীকার করে। মিয়ানমার বলতে চায়, তারা সন্ত্রাসীদের হুমকি মোকাবেলায় অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সেখান থেকে লাখ লাখ আতঙ্কিত মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কারণে। মাহাথির বলেন, কক্সবাজারের ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের বসবাসের সময় যত দীর্ঘ হবে, তারা তত বেশি মরিয়া হয়ে উঠবে। আর মিয়ানমার এখনও রোহিঙ্গাদের ফেরার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। এ সমস্যার সমাধানে মিয়ানমার যদি আন্তরিক হয়ে থাকে, সেটা তাদের দেখাতে হবে। এক্ষেত্রে মালয়েশিয়া সরকারের অবস্থান তুলে ধরে মাহাথির বলেন, রোহিঙ্গারা যাতে নিরাপদে, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদার সঙ্গে ফিরতে পারেন সেই প্রস্তুতি নিতে হবে আগে। আর রোহিঙ্গাদের পুরোপুরি নাগরিকত্বের অধিকার দিলেই কেবল সেটা সম্ভব। তিনি বলেন, এটা স্পষ্ট যে মিয়ানমার সরকার সেখানে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। আর নিপীড়ন-নির্যাতনে দায়ী ব্যক্তিরা যদি প্রশাসনযন্ত্রে সক্রিয় থাকে, তাহলে এ সঙ্কটের সমাধান কীভাবে সম্ভব হয়? ২০১৭ সালের কোন ঘটনার বিচার হয়নি। এমনকি ইন দিন গ্রামের ঘটনায় মিয়ানমার যাদের দোষী সাব্যস্ত করেছিল, তাদের দশ বছরের সাজা দেয়ার পর এক বছরের মাথায় মুক্তি দেয়া হয়েছে।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা স্পষ্ট যে সঙ্কটের সমাধানে কার্যকর কোন উদ্যোগ নিতে মিয়ানমার রাজি নয়। সুতরাং কিছু করার দায়িত্ব এখন আমাদের-আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর বর্তায়। আর সেই দায়িত্ব পালনের শুরুটা জাতিসংঘের মাধ্যমেই হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন মাহাথির মোহাম্মদ। তিনি আরও বলেন, মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যা হয়েছে তা গণহত্যা ও সেখানে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশে মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, আসুন, কোদালকে আমরা কোদাল বলি।
এদিকে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যাকান্ডের তীব্র সমালোচনা করে ওআইসি মহাসচিব ড. ইউসুফ বিন আহমেদ আল ওথাইমিন দোষীদের বিচারের তাগিদ দেন। তিনি আরও বলেন, এটা আমাদের আছে স্পষ্ট যে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমার কোন উদ্যোগই নেয়নি। তারা বিশ্ব নেতাদের চাওয়াকে অবজ্ঞা করছে। জাতিসংঘ কিছু উদ্যোগ নিলেও আজও তা সফল হয়নি।
অন্যদের মধ্যে ন্যাশনাল এ্যাডভাইজারি কাউন্সিল অব নিউরো ডেভেলপমেন্ট ডিজঅর্ডার এ্যান্ড অটিজম অব বাংলাদেশের চেয়ারপার্সন সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

সূত্র :: কাজীর বাজার

শেয়ার করুন:

এই নিউজটি আপনার বাংলাদেশী বন্ধুদের মোবাইলে এসএমএস এ শেয়ার করুন।

AdsMic