Menu

ডেঙ্গু রোগী আসছেই ।। হাসপাতালগুলোতে ঠাঁই নেই ॥ সীমাহীন ভোগান্তিতে আক্রান্তরা

দেশে প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা শহরগুলোতেও ডেঙ্গু আতঙ্ক মহামারি আকার ধারণ করেছে। গত ২৫ জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন ৫৪৭ জন। কিন্তু হাসপাতালের বেড সংকটে চরম ভোগান্তিতে আছেন রোগীরা। ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতালের মেঝে, বারান্দা, চিকিৎসকের চেম্বার এবং লিফটের সামনে থেকে শুরু করে বাথরুমের দরজা পর্যন্ত সর্বত্র রোগীরা বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এদিকে রোগীর ঢল সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরাও। চিকিৎসকরা বলছেন, হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। কিন্তু সে পরিমাণে নেই ডাক্তার বা নার্সের সংখ্যা। ফলে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে রোগী থেকে শুরু করে চিকিৎসকÑ সবারই। এদিকে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা শহরগুলোতেও ডেঙ্গু আতঙ্ক মহামারি আকার ধারণ করেছে। কেউ শরীরে সামান্য একটু জ্বর বোধ করলেই চেকআপের জন্য ছুটে যাচ্ছেন হাসপাতালে। হতে পারে এটি সাধারণ জ্বর বা অন্য কিছু। কিন্তু বর্তমানে কেউ এটাকে সাধারণভাবে নিচ্ছেন না। কারণ এবার ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন কেউ কেউ। তাই একটু জ্বর ওঠা মাত্রই হাসপাতালের দিকে ছুটছেন রোগীরা। এদিকে হাসপাতালের বেডের চেয়ে রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরাও। গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুলাই) স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসাপাতালে সরেজমিনে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। এখানকার চিকিৎসকদের অভিযোগ, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। কিন্তু সে পরিমাণে ডাক্তার বা নার্স নেই। এ জন্য তাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। অন্যদিকে ডেঙ্গুসহ অন্যান্য রোগী বেশি হওয়ায় তাদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের মেঝে, বারান্দা, চিকিৎসকের চেম্বার এবং লিফটের সামনে থেকে শুরু করে বাথরুমের দরজা পর্যন্ত সর্বত্র রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
এদিকে বিগত কয়েক বছরের মধ্যে ২০১৮ সালে ১০ সহস্রাধিক নারী-পুরুষ ও শিশু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার নতুন রেকর্ড হয়েছিল। চলতি বছরের (২০১৯) পাঁচ মাসেরও বেশি সময় বাকি থাকতেই ডেঙ্গু আক্রান্তে গত বছরের রেকর্ড ভঙ্গ হতে চলছে। চলতি বছরের ২৫ জুলাই (বৃহস্পতিবার) পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ৯ হাজার ২৫৬ জন। তাদের মধ্যে চলতি মাসেই সর্বোচ্চসংখ্যক ৭ হাজার ১১২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, কয়েক দিন ধরে যে হারে ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে তাতে আশঙ্কা করা হচ্ছে এ মাস শেষ হওয়ার আগেই গত বছরের আক্রান্ত হওয়ার রেকর্ড ভেঙে যাবে। এদিকে ৯ হাজারেরও বেশি রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেও স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলছেন, দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সিঙ্গাপুর, তাইওয়ানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি হলেও ইতিমধ্যে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৬ হাজার ৯২৬ জন। বর্তমানে রাজধানীসহ সারাদেশের হাসপাতালে ২ হাজার ৩২২ জন ভর্তি রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য হালনাগাদ চিকিৎসা গাইডলাইন প্রণয়নের পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাসহ সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। ডেঙ্গুবাহিত এডিস মশার সংখ্যা কমানোর জন্য বিদেশ থেকে এক ধরনের মশা আমদানি করার চিন্তা-ভাবনা চলছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর,বি) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীর জাদি সাবরিনা ফ্লোরা বলেন, গণমাধ্যম বা অন্যান্য যে কেউ ডেঙ্গুতে মৃত্যু দাবি করলেও রোগ তত্ত্ব ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সমšয়ে গঠিত কমিটি মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে এমন ঘোষণা দিতে পারেন না।
তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আমাদের কাছে মাত্র আটজনের মৃত্যু খবর রয়েছে। এছাড়া গত ২৪ ঘন্টায় ৫৪৭ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য মহাপরিচালক ডেঙ্গু পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দাবি করলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সরকারি হিসেবে ডেঙ্গুতে মৃত্যু সংখ্যা আটজন বলা হলেও বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মৃতের সংখ্যা কমপক্ষে তার তিনগুণ হবে বলে বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রামে প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, ঢাকার মতো চট্টগ্রামেও প্রতিদিন বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। চলতি মাসের শুরুতে ডেঙ্গু রোগী সংখ্যায় কম হলেও বর্তমানে তা চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে পাঁচজন করে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে নগরীর সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার মধ্যে দুই- তৃতীয়ংশ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও বাকিরা এখনো চিকিৎসাধীন আছে।
চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৪২ জন রোগী শনাক্ত করেছে সিভিল সার্জন অফিস। এরমধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ছয়জন ডেঙ্গু রোগী। বাকি চারজনের মধ্যে নগরীর বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালে দু’জন এবং ন্যাশনাল ও সিএসসিআর হাসপাতালে দু’জন চিকিৎসা নিচ্ছেন। সবমিলিয়ে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৪২জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর শনাক্তের তালিকা এসেছে সিভিল সার্জন কার্যালয়ে। জানা গেছে, এর আগে ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম মহানগরীতে ১৭৭ জন, ২০১৭ সালে ৬৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়।
চমেক হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৪ দিনে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৪২ জন রোগী শনাক্ত করেছে সিভিল সার্জন অফিস। এরমধ্যে সাত জন ছাড়পত্র পেলেও বাকি নয়জন এখানো হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এদিকে মরণব্যাধি এ রোগের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্ক দেখা দিয়েছে সবার মাঝে। যদিও আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ চিকিৎসকদের। চিকিৎসকরা বলছেন, ঢাকার মতো এখনো রূপ ধারণ করেনি। বরং চট্টগ্রামে যারা আক্রান্ত হচ্ছে তা নরমাল ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। তবুও সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র আটজন। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িছে ৪২ জনে। এর মধ্যে গত ছয়দিনেই (২০ থেকে ২৫ জুলাই) চট্টগ্রামে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছে ৩১জন। আর গত ছয়মাসে এ সংখ্যা ছিল মাত্র তিনজনের। সবমিলিয়ে চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত ৪২জন ডেঙ্গু রোগীকে শনাক্ত করা হয়েছে। এর বাইরেও চট্টগ্রাম জেলা ও নগরীর অনেক প্রাইভেট ক্লিনিক এবং ডাক্তারের চেম্বারে রোগীরা চিকিৎসা নিলেও সে হিসেব নেই সিভিল সার্জন কার্যালয়ে। তবে চট্টগ্রামে দিনদিন ডেঙ্গু রোগীর প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, এ মাসেই ডেঙ্গু আক্রান্তের প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেছে। তবে যারা আক্রান্ত হয়েছেন, তারা চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ রয়েছেন। আমরা সবসময় তাদের খোঁজ খরব রাখছি।
এদিকে ঢাকায় ডেঙ্গু মহামারী আকার ধারণ করলেও নগরীতে যেন তা ধারণ না করতে পারে সেজন্য সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে ক্রাশ প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শেখ শফিকুল মান্না সিদ্দিকী। তিনি বলেন, এ ক্রাশ প্রোগ্রামের আওতায় নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডের ড্রেনগুলোতে ২৫ হাজার লিটার এডাল্টিসাইড, দশ হাজার লিটার লার্ভিসাইড ছিটানো হচ্ছে। এ কাজে ১৬১ জন কর্মী কাজ করছে। এছাড়া ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
এ মুহূর্তে ড্রেনে ঔষধ না ছিটিয়ে বাসা-বাড়ি এবং প্রতিটি মার্কেটে ছিটানো দরকার বলে উল্লেখ করে সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ডেঙ্গু হয় এডিস মশা থেকে। আর এডিস মশা থাকে পরিস্কার পানি কিংবা পরিষ্কার জায়গায়। ড্রেনের ময়লা পানিতে এডিস মশা থাকেনা। সেখানে সাধারণ মশাগুলোর বসবাস। এখন যেহেতু ডেঙ্গু হওয়ার সময়, তাই এসব ঔষধ ড্রেনে না ছিটিয়ে প্রতিটি বাসা-বাড়ি, অফিস, মার্কেট, কর্পোরেটের আঙ্গিনায় ছিটানো উচিত। তাহলে অন্তত এডিস মশা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।
রংপুরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ১৩ জন হাসপাতালে ভর্তি
রংপুর (সদর) প্রতিনিধি জানান, রংপুরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে ১৩ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন। এরা সবাই ঢাকা থেকে এ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে রংপুর ফিরেছেন। গত মঙ্গলবার থেকে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে জ্বর আক্রান্ত রোগির সংখ্যা বাড়তে থাকে। গতকাল শুক্রবার সকালেও তিনজন ভর্তি হয়েছেন। রমেক হাসপাতাল সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ১ ও ২৯নং ওয়ার্ডে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ১৩ জনের মধ্যে প্রণয়, আতিকুর রহমান, স্বাগত রায়, অনিক ও আবিদের নাম জানা গেছে। বাকিদের নাম এখনো জানা যায়নি।
জানা গেছে, গত চারদিনে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মেডিসিন বিভাগের ১নং ওয়ার্ডে ৫ জন ও ২৯নং ওয়ার্ডে ৮জন ভর্তি হয়েছে। এদের মধ্যে শুরুতে অনেকে প্রচন্ড জ্বর ও মাথা ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে আসেন। পরে রক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে আক্রান্তরা চাকরিসহ বিভিন্ন কারণে ঢাকায় অবস্থানকালে এই জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
রমেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. দেবেন্দ্র নাথ বলেন, ‘ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে তারা আশঙ্কামুক্ত রয়েছেন।’
এব্যাপারে আরো জানতে হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আব্দুল গণির মুঠোফোনে একাধিকবার কল করে তাকে পাওয়া যায়নি।

সূত্র :: সিলেট সংবাদ

শেয়ার করুন:

এই নিউজটি আপনার বাংলাদেশী বন্ধুদের মোবাইলে এসএমএস এ শেয়ার করুন।

AdsMic